নিরাপত্তা ও প্রতারণা

ক্রিপ্টোর নামে এমএলএম ও পঞ্জি স্কিম: এমটিএফই থেকে শিক্ষা

পঞ্জি স্কিম নতুনদের টাকা দিয়ে পুরোনোদের "মুনাফা" দেয়, আর নতুন সদস্য আসা থামলেই ধসে পড়ে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া এমটিএফইর ঘটনা দিয়ে এর কাঠামো ও লক্ষণ বুঝুন।

৩ মিনিটে পড়া · সর্বশেষ যাচাই: ১৪ অক্টোবর ২০২৬

পঞ্জি স্কিম কীভাবে কাজ করে

পঞ্জি স্কিমের নাম এসেছে বিশ শতকের শুরুর দিকের প্রতারক চার্লস পঞ্জির নাম থেকে। কাঠামোটি সহজ:

  1. উঁচু ও নিয়মিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগ নেওয়া হয়।
  2. আসলে কোনো ব্যবসা বা ট্রেডিং থেকে আয় হয় না; নতুন বিনিয়োগকারীদের টাকা দিয়ে পুরোনোদের "মুনাফা" দেওয়া হয়।
  3. প্রথম দিকে সবাই টাকা পান, তাই বিশ্বাস বাড়ে আর তাঁরা আত্মীয়-বন্ধুদের আনেন।
  4. নতুন টাকা আসা কমে গেলে বা আয়োজকরা যথেষ্ট টাকা তুলে নিলে প্ল্যাটফর্ম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।

এমএলএম কাঠামো এর সঙ্গে যোগ করে "রেফারেল কমিশন": আপনার মাধ্যমে কেউ যোগ দিলে আপনি বোনাস পাবেন। এতে প্রতারণা দ্রুত ছড়ায়, কারণ প্রতিটি সদস্যই প্রচারক হয়ে ওঠেন।

ক্রিপ্টো এই প্রতারণাকে আরও সহজ করেছে। "ট্রেডিং বট", "এআই আরবিট্রাজ", "ব্লকচেইন মাইনিং" ধরনের জটিল শব্দ দিয়ে মুনাফার উৎস ব্যাখ্যা করা হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে যাচাই করা কঠিন।

বাংলাদেশের উদাহরণ: এমটিএফই (২০২২-২০২৩)

সংবাদমাধ্যম ও সিআইডির তথ্য অনুযায়ী:

  • শুরু ও প্রচার: ২০২২ সালের জুনে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু হয়। ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন এবং সদস্যদের ব্যক্তিগত প্রচারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী টানা হয়।
  • আস্থা তৈরি: শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা হয়।
  • ভুয়া ব্যালেন্স: সদস্যদের অ্যাপে ভার্চুয়াল "ডলার ব্যালেন্স" দেখানো হতো, কিন্তু তদন্তে জানা যায় এসব লেনদেন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো।
  • ধস: ২০২৩ সালের আগস্টের মাঝামাঝি প্ল্যাটফর্মটি হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। অনেকের অ্যাকাউন্টে উল্টো "ঋণ" দেখানো হয়।
  • ক্ষতির পরিমাণ: কত টাকা হারিয়েছে, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। একটি সংবাদমাধ্যম অন্তত হাজার হাজার কোটি টাকার অনুমান প্রকাশ করেছিল, তবে মোট ক্ষতি এখনো অজানা।
  • তদন্ত: সিআইডি মামলা তদন্ত করছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া কিছু অর্থ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।

সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইউএনবি।

এমটিএফই থেকে কী শিখলাম

যা দেখানো হয়েছিল আসল সত্য
নিয়মিত ও নিশ্চিত মুনাফা বাস্তব ট্রেডিংয়ে নিশ্চিত মুনাফা হয় না
অ্যাপে বাড়তে থাকা ব্যালেন্স স্ক্রিনের সংখ্যা মানেই টাকা নয়
শুরুতে টাকা তোলা গেছে পঞ্জি স্কিম শুরুতে টাকা দেয়, আস্থা কেনার জন্য
পরিচিত মানুষ যোগ দিয়েছেন রেফারেল কমিশনই এই প্রচারের ইঞ্জিন
বিদেশি প্রতিষ্ঠান, আধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশে কোনো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম অনুমোদিত নয়

নতুন নামে একই প্রতারণা

একটি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হলে প্রায়ই নতুন নামে একই রকম আরেকটি আসে। নাম, লোগো আর প্রযুক্তির গল্প বদলায়, কাঠামো বদলায় না। তাই নামের তালিকা মুখস্থ করার চেয়ে লক্ষণগুলো চেনা বেশি জরুরি। দেখুন ক্রিপ্টো প্রতারণা চেনার ১০টি লক্ষণ।

এই লেখায় এমটিএফই সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা প্রকাশিত সংবাদ ও তদন্ত সংস্থার বক্তব্যের ভিত্তিতে। তদন্ত চলমান; নতুন তথ্য এলে এই পাতা হালনাগাদ করা হবে।

মনে রাখার মতো কথা

  • নতুনদের টাকায় পুরোনোদের মুনাফা দেওয়াই পঞ্জি স্কিম; এটি একসময় ধসে পড়বেই।
  • শুরুতে টাকা তুলতে পারা প্রমাণ করে না যে প্ল্যাটফর্মটি নিরাপদ।
  • রেফারেল বোনাস থাকলে আরও বেশি সতর্ক হোন।

সাধারণ প্রশ্ন

এমটিএফই কী ছিল?
এমটিএফই একটি অনলাইন "ট্রেডিং" প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রচার চালাত, যা ক্রিপ্টো ও ডলারে বিনিয়োগে নিয়মিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিত। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী এটি ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশে সক্রিয় ছিল, আর ২০২৩ সালের আগস্টে হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
এমটিএফইর ভুক্তভোগীরা কি টাকা ফেরত পাবেন?
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সিআইডি একটি বিদেশি এক্সচেঞ্জ থেকে প্রায় ৩৬ লাখ ডলার উদ্ধার করেছে, যা যাচাইয়ের পর আদালতের তত্ত্বাবধানে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বণ্টনের কথা। তবে ক্ষতির মোট পরিমাণের তুলনায় এটি সামান্য। সর্বশেষ তথ্যের জন্য সিআইডির ঘোষণা দেখুন।

সম্পর্কিত লেখা